ঘাটতি পুষছে ঋণ, গতি হারাচ্ছে অর্থনীতি

শাহীন হাওলাদার

জাতীয় বাজেট হলো একটি দেশের আয়–ব্যয়ের নকশা। ব্যয়ের সিংহভাগ অর্থ জোগান দেওয়ার কথা রাজস্ব থেকে। অথচ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। প্রতিবছরই বিশাল ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এ ঘাটতি পুষতে সরকারকে বারবার বৈদেশিক ঋণের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে ঋণের চাপ, আর সুদ পরিশোধের দায় ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২১ সালের প্রতিবেদন বলছে, দেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা সাড়ে ১৫ লাখ। সরকারি খাত ছাড়াও বেসরকারি খাতে কোটি কোটি মানুষ কর্মরত। কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ৭ কোটির বেশি। অবশ্য সবাই আয়করের আওতায় পড়েন না। তবে অন্তত দুই কোটি মানুষ নিয়মিত কর দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন—দেশে বর্তমানে কর দেন মাত্র ৪২ লাখ মানুষ। অথচ টিআইএন রয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ ব্যক্তির।

রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশের কর–জিডিপি অনুপাত স্থবির হয়ে আছে ৮–৯ শতাংশে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রতিবেশি দেশ ভারতে যেখানে কর–জিডিপি অনুপাত প্রায় ১৬ শতাংশ, নেপালে তা ১৯ শতাংশের কাছাকাছি।

রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে ঋণ নেওয়া সহজ সমাধান মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর চাপ ভয়াবহ। বাজেটের বড় অংশই চলে যাচ্ছে সুদ ও কিস্তি পরিশোধে। ফলে অবকাঠামো, সামাজিক খাত কিংবা মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয় সীমিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা।

আমি মনে করি রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে তার মধ্যে কর ফাঁকি ও অপ্রদর্শিত অর্থনীতি ও  জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর দুর্বলতা ও জটিলতা অন্যতম। অপরদিকে ব্যবসাবান্ধব করনীতির ঘাটতিজনগণের আস্থাহীনতার জন্য রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না।  আমাদের দেশে কর–জিডিপি অনুপাত ৮–৯ শতাংশ যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। প্রতিবেশি দেশের সাথে তুলনা করলে বিশেষ করে  ভারতে এ হার প্রায় ১৬ শতাংশ এবং নেপালে ১৯ শতাংশের কাছাকাছি।

অথচ দেশের অর্থনীতি এক যায়গায় থেমে নেই। শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বাড়ছে। বিবিএসের ২০২১ সালের প্রতিবেদন বলছে, দেশে সরকারি চাকুরিজীবীর সংখ্যাই সাড়ে ১৫ লাখ। এছাড়া দেশে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ৭ কোটির বেশি। যদিও তাদের সবাই কর দেওয়ার মতো টাকা আয় করেন না। তবে অন্তত দুই কোটি মানুষ কর দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। বর্তমানে দেশে কর দেন প্রায় ৪২ লাখ মানুষ। অন্যদিকে টিআইএন আছে ১ কোটি ১২ লাখ।

পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামে কর-জিডিপি অনুপাত ১৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশ নেপালে এই অনুপাত ২৫ দশমিক ২৯ শতাংশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দ্রুত উন্নতি করা মালয়েশিয়ার কর-জিডিপি অনুপাত ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ। অথচ দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে। এই যখন অবস্থা; ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো ওই দেশের রাজস্ব আয়। আর এই কারণেই কর জিডিপি অনুপাতের এই চিত্র ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা একই সঙ্গে আতঙ্কের ও হতাশার।

অভ্যন্তরীন রাজস্ব আদায় বেশি হওয়ায় দেশগুলো সয়ংসম্পূর্ণতা অর্জণ করতে পেরেছে। অন্যদিকে কর আদায়ে দুর্বলতার কারনে এখনও উন্নয়ন কাজে বিদেশী ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে। অর্থসংকটে আটকে যাচ্ছে এডিপি বাস্তবায়ন। গত বছরে এই হার ছিলো বিগত ৪৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

সরকারি-বেসরকারি জরুরি সেবায় দীর্ঘসূত্রিতা। বেশিররভাগ ক্ষেত্রে এর সমাধান মেলে কাগজের মুদ্রায়। সাধারণ প্রয়োজন ছাড়াও নাগরিকেরা মৌলিক পাঁচটি অধিকার পেতেই হিমশিম খাচ্ছেন। কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা না পেয়ে হতাশা ও ক্ষোভ তাদের হৃদয়ে। রাজস্ব আদায়ের চিত্র দেখলে এর প্রতিফলন দেখা যায়। অর্থনীতির আকারে বিশ্বের ৩৫তম হলেও কর-জিডিপি অনুপাতে বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ।

বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৪৫ হাজার ৫০ কোটি ডলার। এর বিপরীতে কর আদায়ের অনুপাত ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। যেখানে বিশ্বব্যাপী কর-জিডিপি অনুপাতের গড় প্রায় ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ।

রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে শুরু করে অর্থনীতি নিয়ে যারা ভাবেন, তাদের মুখে এই নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে হা-হুতাশ শোনা যায়। কিভাবে কোন কৌশলে রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে এই অনুপাত বাড়ানো যায় তা নিয়ে চলছে বিস্তর গবেষণা ও আলোচনা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতি বছরই বাজেটে করের আওতা না বাড়িয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের হার বাড়িয়ে জনগনের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছে বুলডোজার। তবে কেন দেশের প্রায় ২ কোটি করযোগ্য মানুষ কর দিচ্ছে না এবং বিভিন্ন কৌশলে কর কম দিচ্ছচ্ছে সেটা জানার চেষ্টা করছে না। যুক্তরাষ্ট্র সফর করে রাজস্ব আদায় নিয়ে বড় কোন অভিজ্ঞতা না থাকলেও সাধারণ জনগণ বিশেষ করে যারাই আয় করছেন তাদের আয়ের উপর কর কর্তন ব্যবস্থা খুবই সুন্দর।

দেশের মানুষের সক্ষমতা থাকলেও তারা করের টাকা সঠিকভাবে ব্যয় হবে না এমনটি মনে করেন। তাই কর দিতে অনীহা রয়েছে তাদের। সরকারি কর্মচারিরা করের টাকায় বেতন ভাতা পেলেও তাদের দুর্বব্যবহার ভুলতে পারেন না সাধারণ মানুষ। সেবা প্রত্যাশীদের ভোগান্তি লাঘব ও করের টাকার সঠিক ব্যবহার রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে না পারলে কর আদায় বাড়ার সম্ভাবনা দুর্বল। তাই এক্ষেত্রে বিষয়গুলো সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে রাষ্ট্রকে।তাহলে দেশের কর আদায় বেড়ে অন্তত দ্বিগুণ হতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। কর-জিডিপি অনুপাত ২০৩৫ সালের মধ্য সাড়ে ১০ শতাংশ করার লক্ষ্য নিয়েছে এনবিআর। যা অত্যন্ত অপ্রতুল। তবে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, ব্যয়ে স্বচ্চতা, সেবায় দ্রুততা আসলে একই সময়ের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত বেড়ে ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতার অভাব, উন্নয়ন প্রকল্পে উচ্চ ব্যয়, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সব ধরণের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে জনভোগান্তি হলেও জবাবদিহিতার অভাব প্রবল আকার ধারণ করেছে।

যদিও কর আদায় বাড়াতে নানামুখী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস অনুবিভাগে অটোমেশন অন্যতম। এনবিআরকে ভেঙে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ করার উদ্যোগও এখন আলোর মুখ দেখার অপেক্ষায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের চাপের মুখেই মূলত সংস্কারে গুরুত্ব দিয়েছে সরকার।

তবে বর্তমানে প্রতি অর্থবছরে অন্তত ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে এনবিআর। শুধুমাত্র অটোমেশনের মাধ্যমে এ হারানো কর আদায় করা সম্ভব নয়। এজন্য শুধু এনবিআর সংস্কার নয়, সম্পূর্ণ রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন।

উন্নত বিশ্বের একজন নাগরিক তার শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মহীন থাকলে বেকার ভাতা, সহজে বিভিন্ন ধরণের সনদ পাওয়া, বার্ধক্যে সরকারি পেনশন ও সুবিধা, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আইনগত সুরক্ষা পেয়ে থাকেন। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসব সুবিধা শুধুমাত্র কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ।

প্রকতপক্ষে একজন নাগরিক বা করদাতা চান তার দেওয়া করের বিনিময়ে প্রাপ্য সম্মান ও নাগরিক সুবিধা চান। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান। কিছু দেওয়ার বিনিময়ে কিছু না পেলে করদাতারা কখনোই কর দিতে উৎসাহিত হবেন না। এক্ষেত্রে যত অটোমেশন বা সংস্কারই করা হোক না কেন-তাতে ফল আসবে না। ফল পেতে পরিবর্তন দরকার রাষ্ট্রের। নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের জন্য এনবিআর নয়, দায়ী রাষ্ট্রের ভঙ্গুর ব্যবস্থা।

রাষ্ট্রের সামগ্রিক পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবর্তন দরকার এনবিআরেরও। সেক্ষেত্রে ই-টিআইএন চালু করলেই দায় শেষ নয়, এর সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ করাও জরুরি। করদাতাদের এই সার্ভার ব্যবহারের বাজে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তার মান উন্নয়ন করতে হবে। ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোকে সচল রাখতে হবে। ভ্যাট নিবন্ধন ও রিটার্ন জমার পদ্ধতি সহজ করলে ভ্যাটদাতারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন।

কাস্টম হাউসে দালালের দৌরাত্ম দমন করতে হবে। বাড়াতে হবে মনিটরিং। পাশাপাশি বন্দরে কন্টেইনার জট যাতে তৈরি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। তাতে করদাতারা স্বস্তি পাবেন, আমদানি-রপ্তানিতে ফিরবে গতি। সরকারের কর আদায়ও বাড়বে। তবে কর আদায়ে মনযোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে করদাতার প্রাপ্তিও বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

অর্থনীতি এগোচ্ছে, শিল্প ও কর্মসংস্থান বাড়ছে, কিন্তু রাজস্ব আহরণের গতি বাড়ছে না। সুতরাং সময় এসেছে কর ব্যবস্থাকে সংস্কার, কর-নেতৃত্বাধীন প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাজস্ব সংস্কৃতি গড়ে তোলার। বৈদেশিক ঋণ সাময়িক সমাধান দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনীতিকে ঋণের ফাঁদে ফেলবে। তাই কর-সংস্কার ও করদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট ,

সদস্য , ন্যাশনাল প্রেস ক্লাব, ওয়াশিংটন

sahinhowladar@gmail.com

দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে প্রকাশিত লিংক

https://dailyinqilab.com/economy/news/803716