আমার দেখা নিউইয়র্ক শহর

বয়স যখন তেরো, বইয়ের পাতায় দেখেছি আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের বিখ্যাত কিছু স্থাপনার গল্প। স্কুল জীবন থেকেই মনের গভীরে লুকিয়ে ছিল সেই সব বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানগুলো বাস্তবে দেখার। সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত থাকায় ৩৪ বছর বয়সে এসে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রুপ নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। বহুবছরের সেই স্বপ্ন হাতছানি দিয়ে ডেকে নিয়ে এসেছে নিউইয়র্ক শহরে। স্বপ্নের নিউইয়র্ক শহর নিয়ে লেখার অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম।  

আমার চোখে নিউইয়র্ক শহর বিশ্বের অন্যান্য শহরের চাইতে ব্যাতিক্রম। শুধু শুধু এ শহরকে সারা পৃথীবির রাজধানী বলা হয়? তা কিন্তু নয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশের মানুষই এখানে বসবাস করে। এখানকার মানুষ খুবই বন্ধুসুলভ। স্বপ্নের এই শহরে কেউ আসেন জীবিকার সন্ধানে, কেউবা ঘুরতে কিংবা কেউবা অফিসিয়াল কাজে। আমার জানামতে পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র নিউইয়র্ক শহরই পাওয়া যায় যেখানে প্রায় সব দেশের মানুষ বসবাস করে। একই ছাতার নিচে নানা ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও নানা সংস্কৃতির শহর নিউইয়র্কের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ হলেও এর বিস্তৃতি অনেক যার অনুভূতি লেখার ভাষায় প্রকাশ করা খুব কঠিন। তবে এক কথায় এখানকার মানুষের আচরণ খুবই বন্ধুসুলভ। এখানকার মানুষের কাজ যে কোন তথ্য জানতে চাইলে সে তথ্য দেওয়ার জন্য এতটাই ব্যস্ত হয়ে উঠে তা না দেখলে আপনাকে বুঝাতে পারবো না। আর যে কোন উপকার করতে পারলেই নিজেকে খুব ধন্য মনে করে। বিনিময়ে চায় শুধু ধন্যবাদ নামের শব্দটা। ধন্যবাদ, স্বাগতম, আপনার সাথে দেখা হয়ে ভাল লাগল এমন তিনটা শব্দ এদের নিত্যদিনের সঙ্গি। আবার নিউইয়র্ক শহরের আইনের প্রতি সবাই শ্রদ্ধাশীল। পুলিশি সহায়তা, শহরকে নিরাপদ রাখতে বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ নানা নিয়মানুবর্তীতা তা এ শহরে না আসলে কখনোই উপলব্ধি হতো না। 

আবার নিউইয়র্ক শহর নানা ছদ্মনামেও পরিচিত যার মধ্যে একটি হলো নিউইয়র্ক শহর কখনোই ঘুমায় না! আসলেই তাই! এখানকার মানুষের ব্যস্ততা সত্যিই প্রশংসনীয়। সবচাইতে বড় কারণ হলো নিউইয়র্কের সাবওয়ে সিস্টেম আমার কাছে একটি গোলকধাঁধা। যে কেউ ইচ্ছা করলে রাত দুইটা, তিনটা, চারটা অথবা যখন খুশি বাইরে যেতে পারেন এবং বাড়িতে ফিরতে পারেন। আরেকটি অন্যতম কারণ হতে পারে নিউইয়র্কের অলিগলিতে প্রচুর ক্যাফে, দোকান, ওষুধের দোকান, রেস্তোরাঁ রয়েছে, যা সারা রাত খোলা থাকে। সপ্তাহে ৫ দিন কাজের চাপে কারোই ধম ফেলানোর সময় পায় না। তবে সাপ্তাহিক ছুটিসহ যেকোন ছুটির দিনগুলো তারা খুব সুন্দরভাবে উপভোগ করে। যার ফলে পুরো সপ্তাহের সব ক্লান্তি ভুলে যায়।

বাংলাদেশ থেকে আসা সবাই এখন আমেরিকার পরিবেশে-সংস্কৃতির সাথে অনেকটাই মিশে গেছে। নিউইয়র্কে আবহাওয়ার কোন গ্যারান্টি নাই। রাতে ঘুমের সময় আবহাওয়া একভাবে দেখলেও সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবেন আবহাওয়ার সম্পূর্ণ পরিবর্তন। অর্থ্যাৎ প্রতি ঘণ্টায় এখানের আবহাওয়া পরিবর্তন হয়। তাই প্রতিমূহুর্তে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখা এখানকার মানুষের নিত্যদিনের রুটিন। আবহাওয়ার উপর নির্ভর করেই বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়।
  
নিউইয়র্ক শহরের বুকে একখন্ড বাংলাদেশ : নিউ ইয়র্ক শহরটিতে বহুসংখ্যক আবাসিক ও অনাবাসিক এলাকা রয়েছে এবং এগুলিকে প্রশাসনিকভাবে পাঁচটি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে; যথা- ম্যানহাটন, ব্রুকলিন, দ্য ব্রংক্স, কুইন্স এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ড, যাদের প্রতিটিরই নিজস্ব জীবনধারা রয়েছে। তবে সবচাইতে আনন্দের বিষয় হচ্ছে নিউইয়র্কের এসব অঞ্চলের জ্যাকশন হাইটস, ব্রুকুলিন, জামাইকা ও ব্রঞ্জসহ কয়েকটি এলকা ঘুরে মনে হচ্ছে আমেরিকার বুকে একখন্ড বাংলাদেশ। বিশেষ করে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের চার্চ ম্যাকডোনাল্ডের জায়গাটি বাঙালি কমিউনিটির মিলন মেলা হিসেবে পরিচিত। নিউইয়র্কে যতদিন ছিলাম বেশিরভাগ সময়টিতেই এ জায়গাটিতে কেটেছিল।  

ব্রুকলিনে বৃহত্তম কমিউনিটি হচ্ছে সন্দ্বীপের মানুষ। প্রতি বছরই এখানে বাঙালি কমিউনিটির সর্ববৃহৎ পথ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজক কমিউনিটির এ পথ মেলায় এসে এত বাঙালি একই ছাতার নিচে দেখে মনে হয়নি যে আমেরিকার মাটিতে রয়েছি। এখানে এসে জানতে পারি ব্রুকলিনের চার্চ ম্যাকডোনাল্ডের জায়গাটি লিটল বাংলাদেশে বাঙালি কমিউনিটির জন্য নতুন একটি প্লাজা। এই প্লাজা বাঙালি কমিউনিটির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এখানে যেকোনো মিলনমেলা, সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক সভা সমাবেশ করা যাবে। এখানে যেকোনো সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে বাঙালি কমিউনিটি। বাংলা ভাষাভাষী বাঙালি এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি মার্কিন সরকারের বিশেষ আন্তরিকতার প্রাপ্তি এই প্লাজা। অপরদিকে নিউইয়র্কের কয়েকটি রাস্তার নামকরণ বাংলাদেশ স্ট্রেট নামে দেখে নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে খুব গর্ববোধ করেছি। অধিকাংশ দোকান-হোটেল রোস্তোরাগুলোর সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা একই সঙ্গে এসব এলাকায় আড্ডা মারলে মনে হয় সত্যিই আমি বাংলাদেশে আছি।